মা, আমি আবার ছোট্ট হতে চাই!

avatar
(Edited)

আজ মা ফোন দিলেন।

এখন আর আগের মত ফোন দেয় না। দিলেও ভয়ে ভয়ে ফোন দেয়। না জানি আবার ব্যস্ততার মাঝে ফোন দিয়ে ডিস্টার্ব না করে বসেন। ফোন দিয়েই নিজেকে অপরাধীর মত কৈফিয়তের সুরে বললেন, পান সুপারী শেষ তাই ফোন দিলাম। তুমি তো ব্যাস্ত থাক পরে ফোন দিব।

অনেক ভেবে দেখলাম মা আসলেই এখন আর ফোন দেয় না কোন কিছুর জন্য। ফোন দিলেও যাতে বিরক্ত না হই তাই দ্রুত কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কথা শেষ করে ফোন রেখে দেয়। অবশ্য এই দুপুর সময়টা একটু অফিসে ব্যাস্তই থাকি সেটা মা জানে। তাই মাঝে মধ্যে একেবারে উপায় না পেলে ফোন দিয়ে কৈফিয়তের সুরে কথা বলে কাঁচুমাচু করেই ফোন রেখে দেয়।

সময়ের সাথে সাথে বাবা মা থেকে শুরু করে সব চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে। বিশ বাইশ বছর আগে মা বাবাদের আচরণ আর এখনকার আচরণ পুরাই বিপরীত ধর্মী।

এই তো মনে হচ্ছে খুব বেশিদিনের কথা নয়। তারপরেও শিশুকালের কথা। মা বাবার শাসনের ধরন আর এখনকার বিষয়টু একটু মিলিয়ে দেখলেই নিজেকে খুব একটা অপরাধী মনে হয়। এখন মনে হয় মা বাবারাই আমাদের ভয় পায়। অথচ একটা সময় ছিল বাসা থেকে বার হওয়া বাসায় প্রবেশ করার নির্দিষ্ট সময় ছিল। সময়ের এক মিনিট এদিক ওদিক হলেই হরেক রকমের উত্তম মাধ্যম।

ছোট থাকতে ভাত ঘুম দেওয়াটা ছিল বাধ্যতামূলক। ভাত ঘুম বলতে দুপরে খাওয়া দাওয়া সেরে বিশ্রামের ঘুম। ঘুম না ধরলেও যেন জোর জবরদস্তি চোখ চেপে ধরে শুয়ে থাকতে হবে। আমার আবার ঘুম কখনোই ধরতো না আমার কাছে সেটা মনে হত পৃথিবীর সব থেকে নিকৃষ্টতম নির্যাতন।

করা পাহারার ভিতরেও টম এন্ড জেরির মত পা চেপে চেপে কখনো কখনো চুড়ই পাখির মত ফুরুৎ হয়ে যেতাম রিমান্ডের ভয় উপেক্ষা করে। তবে যাই করি না কেন মাগরিবের আজান হওয়ার সাথে সাথে বাসায় ফিরতেই হত। তবে মাঝে মধ্যে দেরি হয়ে গেলে সামনের দরজা দিয়ে তো সম্ভব নয় পিছনের দরজা দিয়ে কোন মতে বাথরুমে ঢুকেই অল্প পানি দিয়ে ফ্রেশ হতাম সাবধানতার সহিত যাতে পানির আওয়াজ কানে না যায়। ফ্রেশ হয়েই টুপ করে পড়ার টেবিলে বসলেই হল। তা না হলে বাসায় ফেরার আগে মা বাবা নামাজে দাঁড়িয়ে গেলে নামাজ শেষে আর রক্ষা নেই। মাঝে মধ্যে দুরুদুরু বুকে ভীরু ভীরু পায়ে ঢুকতেই টুক করে লাইট জ্বলে উঠতো। ধরা পরলে হাড্ডি মাংস একাকার তো হতোই সাথে পড়ার সময় টাও বেড়ে যেতো ঐদিন। বই হতে উঠার কোন সুযোগ ও সাহস কিছুই থাকতো না। ঘুমের মধ্যে টুপতে টুপতে ঘুমিয়ে যাওয়াটাই ছিল সেই শাস্তি হতে মুক্তির এক মাত্র পথ। তবে মাঝে মাধ্যে উপায়ান্তর না পেয়ে ঘুমের অভিনয় ও করতে হত। এই সেই অভিনয় না অস্কার পাওয়ার মত অভিনয়। মঝে মধ্যে মা পাশেই বসে থাকতেন। মায়ের শাড়ির একটা ঘ্রান থাকতো। সেই ঘ্রানের মাদকতা এতোটাই ছিল যে ঘুম ধরতো খুবই দ্রুত।

আমাদের বাড়ির সাথেই প্রাইমারী স্কুল। আমাদের এলাকাটা পুরোটাই আমার বড় আব্বু আর চাচারাই। সবাই আমাদের বলে রাবনের গুষ্টি। আমার সব থেকে কঠিন সময় যেত যখন রাতে বিদ্যুত চলে যেতো। সবাই বাসা থেকে বার হয়ে স্কুল মাঠে চিল্লাচিল্লি করতো। হৈ হুল্লর করতো। আর আমরা কুপের আলোয় বই নিয়ে বসে থাকতাম। পড়াশুনা তো ঘোড়ার ডিম হত ঐ সময় বরং স্কুল মাঠের সবার আওয়াজে কলিজা পুরে ছাড় খার হয়ে যেতো বাইরে গিয়ে তাদের সাথে খেলতে না পারার কারনে। কখনো কখনো তো বন্ধুরা চিল্লায়া চিল্লায়া আমাকে ডাকতো আমাকে জ্বালানোর জন্য। তারা কি কি করতো এইসব পরের দিন স্কুলে বা খেলার মাঠে দেখা হলে ব্যাখ্যা দিত। কি এক যন্ত্রণাই না ছিল সেই সময়।

এই সিলসিলা জারি ছিল মাধ্যমিক পাশ না করা পর্যন্ত। যখন কলেজে ভর্তি হলাম তখন কিছুটা সিথিল হল। শুধু মাত্র রাতে বিদ্যুত চলে গেলে স্কুল মাঠে যেতে পারবো। বিদ্যুত চলে এলে এক মুহুর্ত আর বাহিরে থাকা যাবে না। বাসায় এসে বই নিয়ে বসতে হবে।

যখন উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইলাম তারপর থেকে বাড়ি থেকে সকল বাধা নিষেধ তুলে নিয়ে আল্লার ষারের মত ছেরে দিয়েছিল। ততদিনে মা বাবা আমার প্রতি সেই আস্তাটা পেয়েছিল।

সেই সময়ে মা বাবার শাসনে ছিলাম। বাবা কোনদিন একটা উচ্চবাচ্য না করলেও ভয় পেতাম। আর মায়ের হাতে প্রচুর মার খেয়েছি।স্কুল না যাওয়ার জন্য কোন অযুহাত চলে নিই মা এর কাছে।

শুধু যে শাসন ছিল তা নয় কখনো কখনো সেই পিচ্চি বাবুটা আইসক্রিম উয়ালার ঘন্টা শুনে দৌড়ে আসতো। মা, ওমা এক টাকা দেন না। মা আইসক্রিম খাবো। এক টাকা দুই টাকার আবদার কখনো রাখতো আবার কখনো আইসক্রিম কিনে দিত। আমরা চুশে চুশে আইসক্রিম খেতাম আর মা পরম স্নেহে প্রাণ ভরে দেখতো। আর আমি বলতেও ভূলে যেতাম মা আপনিও খান।

সেই মা বাবা এখন আমাদের ভয় করে। কি না আমরা রাগ হয়ে যাই। কিনা ওনাদের কোন কারণে আমাদের কাজের ব্যাঘাত ঘটে যায়।

মা, আমি আবার ছোট হতে চাই। তোমার আঁচলের কোনায় গিট্টু দিয়ে বেধে রাখা টাকা থেকে আবার আইসক্রিম কিনে খেতে চাই তোমার সামনে দাঁড়িয়ে।

images (5).jpeg

SOURCE



0
0
0.000
2 comments